
স্বামীর বাড়ির সিলিংয়ে রশির সঙ্গে ঝুলছিল গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালির (২২) মরদেহ। আর ছিল তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসানের (নাজিফ) নিথর দেহ। শিশুটিকে বাথরুমের বালতির পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল।
খবর পেয়ে বাগেরহাট সদর মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তারা কানিজের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। কানিজ নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের স্ত্রী। সাদ্দাম বর্তমানে যশোর কারাগারে আছেন।
কানিজের স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য ছিল, স্বামীকে মুক্ত করতে না পেরে মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভুগছিলেন কানিজ। এ থেকে তিনি শিশুসন্তানকে হত্যা করে পরে আত্মহত্যা করেছেন।
সাদ্দামের ছোট ভাই মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, শুরুতে দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্ব ছিল। পরে তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর ওই পরিবার থেকে সবাই আসেন। দুই পরিবার তাঁদের বিয়ে মেনে নেয়। তবে গত দুই মাস তাঁর ভাবির পরিবার থেকে তেমন আসা-যাওয়া ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমার ভাবি ভাইকে খুব ভালোবাসত। তাঁকে জেল থেকে বের করতে না পারায় সে অনেক ভেঙে পড়েছিল।
শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাবি শুধু বলত, “আপনার ভাই কি ছাড়া পাবে না?” বিভিন্নজন বিভিন্ন সময় তাকে বলেছে যে সে কখনোই ছাড়া পাবে না। ছাড়া পেলেও স্বামী যে ভাইরাল হইছে, তাকে মেরে ফেলবে। এগুলো নিয়ে সে খুব হতাশ ছিল। আমরা চারবার ভাইয়ের জামিন করিয়েছি। কিন্তু আবার নতুন মামলায় জেলগেট থেকে নিয়ে যায়।’ সাদ্দামের নামে এখনো ১১টি মামলা আছে বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, সব কটি রাজনৈতিক মামলা।
কানিজের ভাই শাহ নেওয়াজ আমিন বলেন, সাদ্দামের স্ত্রী হওয়ার কারণে অনেক সময় রাস্তাঘাটে অনেক কটু কথা শুনতে হতো তাঁর বোনকে।
জেলগেটে স্ত্রী-সন্তানকে শেষবারের মত দেখা
কানিজ ও তাঁর সন্তান সেজাদের মরদেহ শনিবার লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কারাগারের সামনে নেওয়া হয় বন্দী সাদ্দামকে শেষবার দেখানোর জন্য। সেখানে সাদ্দাম পাঁচ মিনিটের কম সময় পান তাদের দেখার জন্য। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই বাচ্চাকে কোলে নিতে পারেনি। এই আক্ষেপে গতকাল বলছে, “জীবিত অবস্থায় আমি আমার বাচ্চাকে কোলে নিতে পারলাম না, মৃত্যুর পর কোলে নিয়ে কী করব?” সে সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছে, “আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না, আমি ভালো স্বামী হতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।” এটা ছিল আমার ভাইয়ার শেষ কথা।’
কানিজ সুবর্ণার ভাই মো. শুভ বলেন, ‘ছেলেটারে আমার দুলাভাই একবারও কোলে নিতে পারেনি। শেষবারের জন্য যেন একটু দেখতে পারে, তাই নিয়ে (কারাফটকে) গিয়েছিলাম।’
কানিজের বাবা রুহুল আমিন বলেন, ‘কারাগারে ৫ মিনিটও সময় পায়নি সাদ্দাম। সেখানে সে সন্তানকে আর কোলে নেয়নি। কানিজকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানায়।’
প্রসঙ্গত, স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর স্ত্রীর কাছে সাদ্দামের লেখা বলে একটি চিঠি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই চিঠিতে সন্তানকে কোলে নিতে না পারার আক্ষেপের কথা আছে।
স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সবখানে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
কারাফটকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন সাদ্দাম। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। স্ত্রী–সন্তানের মৃত্যুতে সাদ্দামকে কেন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
সাদ্দামকে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এক মামলায় প্রথম তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অথচ এজাহারে তাঁর নাম ছিল না। এ মামলায় তাঁর জামিন হয়। এরপর তাঁর নামে আরেকটি মামলা দেওয়া হয়। যখনই জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছায়, তখনই আরেকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এমন ছয়টি মামলায় তাঁর জামিন হয়েছে। জামিনের পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, এটি হচ্ছে সপ্তম মামলা।
এই মামলা ২০২৫ সালের মার্চে বাগেরহাটে করা হয়েছিল জানিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ বলেন, এই মামলার এজাহারে ৩৮ জনের নাম আছে, সাদ্দামের নাম নেই। অথচ এই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই মামলায় কেন তাঁকে নিয়মিত জামিন দেওয়া হবে না, সেই রুল দিয়ে হাইকোর্ট সাদ্দামকে ছয় মাসের অন্তবর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মন্তব্য করুন