
গোসল ফরয হলে তার জন্য পবিত্র অতিব জরুরি
যার উপর গোসল ফরয তার জন্য পবিত্র হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিম্ন বর্ণিত পাঁচটি কাজ করা নিষেধ।
১. সালাত আদায় করা
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ইমানদাররা, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাত আদায় করো না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা বুঝতে পার যে, তোমরা নামাযে কী বলছ । তাছাড়া বড় নাপাকি হয়ে গেলে গোসল না করে সালাত আদায় করো না।” (সূরা ৪; নিসা ৪৩)
২. কুরআন কারীম স্পর্শ করা
ইবনে ওমর (রা) বর্ণনা করেন যে, ‘পবিত্র না হয়ে কুরআন কারীম স্পর্শ করবে না।’ (দারা কুতনী: ৪৩১)
৩. কুরআন তিলাওয়াত করা
আলী (রা) বলেন যে, “রাসূলুল্লাহ (স) সদাসর্বদা আমাদেরকে কুরআন পড়িয়েছেন, তবে যখন বড় নাপাকি অবস্থায় থাকতেন সে সময় ছাড়া।” (তিরমিযী: ১৪৬, আহমদ: ১০১৪)।
৪. মসজিদে অবস্থান
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, “হায়েযওয়ালী নারী ও গোসল ফরয এমন নাপাক ব্যক্তির জন্য মসজিদে যাওয়া বৈধ করি না। (আবু দাউদ: ২৩২)।” তবে মসজিদের ভেতর দিয়ে অন্য কোথাও যেতে চাইলে তা বৈধ।
৫. কাবা ঘর তাওয়াফ করা
রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, অর্থাৎ আল্লাহর ঘর কাবায় তাওয়াফ করা নামায আদায় তুল্য।’ (নাসাঈ: ২৯২০)
ফরয গোসলের প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা’আলার বাণীঃ কিন্তু যদি তোমরা অপবিত্র থাক তবে উত্তমরূপে পবিত্র হবে। আর যদি তোমরা পীড়িত হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা সেরে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রী সহবাস কর, তারপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে-ঐ মাটি দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসহ(মাসেহ) করে নিবে। আল্লাহ্ তোমাদের অসুবিধায় ফেলতে চান না, বরং তিনি তোমাদের পাক-পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামাত পূর্ণ করতে চান, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (সূরাহ্ আল-মায়িদাহ্ ৫/৬)
ফরয গোসলের নিয়ম:
১. সর্বপ্রথম দুহাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা।
২. শরীর ও কাপড়ের যেখানে নাপাক লেগেছে সেই নাপাকি দূর করা।
৩. কাঁচা (মাটির) গোসলখানা হলে ফ্লোরের মাটিতে অথবা কাঁচা দেয়ালে হাত ঘষে অথবা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেয়া। পাকা গোসলখানা হলে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেয়া।
৪. নামাযের জন্য যেভাবে ওযু করা হয় সেভাবে অজু করা।
অবশ্য অযুর মধ্যে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া সুন্নত হলেও ফরয গোসলের পূর্বে যে ওযুর করা হয়, সেই ওযুতে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া ফরয।
অতএব কুলি ও নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটু বেশি গুরুত্ব দেয়া। অর্থাৎ গরগরার সহিত কুলি করা। নাকে পানি দেয়া ও নাক ঝাড়া।
৫. গোসলখানার ফ্লোরে ব্যবহৃত পানি জমা হলে ওযুর শেষে পা ধোয়ার প্রয়োজন নেই। গোসল শেষে এই স্থান ত্যাগ করে পা ধুয়ে নিবে।
আর যদি ফ্লোরে পানি না জমে, তাহলে ওযুর সঙ্গে পা ধুয়ে নিতে পারবে।
৬. ওযুর শেষে তিন কোষ পানি মাথায়, তিন কোষ পানি ডান কাঁধে, তিন কোষ পানি বাম কাঁধে দিয়ে, পুরো শরীর ধৌত করবে।
হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নেশায় মত্ত অবস্থায় সালাতের কাছেও যেও না যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার; আর অপবিত্র অবস্থায় নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা গোসল কর, তবে মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে অথবা তোমরা স্ত্রী সহবাস করে থাক এবং পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও- মাসেহ করবে স্বীয় মুখমণ্ডল ও হাত। নিশ্চয় আল্লাহ্ হলেন অতিশয় মার্জনাকারী, পরম ক্ষমাশীল। (সূরাহ্ আন-নিসা ৪/৪৩)
২৪৮. ’আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জানাবাতের গোসল করতেন, তখন প্রথমে তাঁর হাত দু’টো ধুয়ে নিতেন। অতঃপর সালাতের উযূর মত উযূ করতেন। অতঃপর তাঁর আঙ্গুলগুলো পানিতে ডুবিয়ে নিয়ে চুলের গোড়া খিলাল করতেন। অতঃপর তাঁর উভয় হাতের তিন আজলা পানি মাথায় ঢালতেন। তারপর তাঁর সারা দেহের উপর পানি ঢেলে দিতেন। (২৬২, ২৭২; মুসলিম ৩/৯, হাঃ ৩১৬, আহমাদ ২৫৭০৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৪১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪৬)
গোসল সংক্রান্ত অনেকগুলো বর্ণনা রয়েছে। নিম্নে একটি হাদীস উল্লেখ করা হল।
وَحَدَّثَنِي عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ السَّعْدِيُّ، حَدَّثَنِي عِيسَى بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ، عَنْ سَالِمِ بْنِ أَبِي الْجَعْدِ، عَنْ كُرَيْبٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ حَدَّثَتْنِي خَالَتِي، مَيْمُونَةُ قَالَتْ أَدْنَيْتُ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم غُسْلَهُ مِنَ الْجَنَابَةِ فَغَسَلَ كَفَّيْهِ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي الإِنَاءِ ثُمَّ أَفْرَغَ بِهِ عَلَى فَرْجِهِ وَغَسَلَهُ بِشِمَالِهِ ثُمَّ ضَرَبَ بِشِمَالِهِ الأَرْضَ فَدَلَكَهَا دَلْكًا شَدِيدًا ثُمَّ تَوَضَّأَ وُضُوءَهُ لِلصَّلاَةِ ثُمَّ أَفْرَغَ عَلَى رَأْسِهِ ثَلاَثَ حَفَنَاتٍ مِلْءَ كَفِّهِ ثُمَّ غَسَلَ سَائِرَ جَسَدِهِ ثُمَّ تَنَحَّى عَنْ مَقَامِهِ ذَلِكَ فَغَسَلَ رِجْلَيْهِ ثُمَّ أَتَيْتُهُ بِالْمِنْدِيلِ فَرَدَّهُ .
‘আবূদল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
তিনি বলেছেন, আমার খালা মাইমুনাহ্ আমাকে বলেছেন, আমি রসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অপবিত্রতার গোসলের জন্যে পানির পাত্র এগিয়ে দিতাম। তিনি প্রথমে দু’হাতের কব্জি পর্যন্ত দু‘বার অথবা তিনবার ধুয়ে নিলেন। তারপর পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বাম হাতে লজ্জাস্থান ধুয়ে পরিষ্কার করলেন। পরে বাম হাতখানা মাটিতে খুব করে রগড়ালেন, এরপর ধুয়ে নিলেন। অতঃপর উক্তস্থান থেকে সরে গিয়ে পা দু’খানা ধুলেন। অতঃপর আমি তাঁর শরীর মোছার জন্যে কাপড় বা রুমাল নিয়ে আসলে তিনি তা ব্যবহার না করে বরং ফেরত দিলেন।
—সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৬০৯
টীকা : অন্যান্য সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অজু ও গোসলের পর পানি মোছার জন্য গামছা ব্যবহার করেছেন বলে প্রমাণিত রয়েছে।
এই হাদীসে যেই দিনের কথা উল্লেখ রয়েছে তখন হয়ত গরমের কারণে নবীজির চেয়েছিলেন পানি গায়ে শুকিয়ে যাক। তাহলে কিছুটা ঠান্ডা অনুভব হবে।
والله أعلم
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসহাক মাহমুদ
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মন্তব্য করুন