
বর্তমান সময়ে দেশে গ্যাস সংকট, সিলিন্ডারের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, এবং নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে শহুরে পরিবারগুলোতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি প্রযুক্তি হলো ইন্ডাকশন চুলা ও ইনফ্রারেড চুলা ।
ইন্ডাকশন এবং ইনফ্রারেড চুলা এখন রান্নাঘরের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই দুই ধরনের চুলার কাজের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়াতে পাত্র নির্বাচন ও ব্যবহারের নিয়মও আলাদা। ইন্ডাকশন চুলা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাধ্যমে পাত্রের তলাকে সরাসরি গরম করে। ফলে চুলার উপরিভাগ তুলনামূলক ঠাণ্ডা থাকে। অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলা ‘হিটিং এলিমেন্টে’র সাহায্যে কাচের প্লেট গরম করে এবং এই তাপ পাত্রে স্থানান্তরিত হয়।
ইন্ডাকশন চুলায় শুধুমাত্র ফেরোম্যাগনেটিক (লোহা বা স্টিলভিত্তিক) পাত্র ব্যবহার করা যায়। পাত্রের তলায় চুম্বক লেগে থাকে এমন হলে, তা ইন্ডাকশনের জন্য উপযোগী।
অ্যালুমিনিয়াম, কাচ, সিরামিক বা তামার পাত্র এখানে কাজ করবে না। পাত্রের তলা অবশ্যই সমতল ও পরিষ্কার হতে হবে। পাত্র ছাড়া চুলা চালু করলে যন্ত্র কাজ করবে না এবং অতিরিক্ত চেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইনফ্রারেড চুলায় সব ধরনের পাত্র ব্যবহার সম্ভব । ইনফ্রারেড চুলায় স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, কাচ, সিরামিক— প্রায় সব ধরনের পাত্রই ব্যবহার করা যায়। তবে পাত্রের তলা সমতল হওয়া জরুরি, কারণ বাঁকা তলায় তাপ সমানভাবে ছড়ায় না।
রান্নার পর কাচের প্লেট কিছুক্ষণ গরম থাকে, তাই হাত দেওয়ার আগে অপেক্ষা করতে হবে। অতিরিক্ত ভারী পাত্র জোরে রাখলে কাচের প্লেট ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাপ নিয়ন্ত্রণে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ তাপ ধীরে কমে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক ইন্ডাকশন চুলা ও ইনফ্রারেড চুলার সুবিধা অসুবিধা সহ বিস্তারিত এবং কোনটি আপনার জন্য ভালো?
ইন্ডাকশন চুলা কীভাবে কাজ করে
ইন্ডাকশন চুলা চুম্বকীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করে। এতে চুলার ওপর রাখা পাত্রের তলায় সরাসরি বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে তাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ চুলা নিজে গরম হয় না, গরম হয় কেবল হাঁড়ি বা কড়াইয়ের তলদেশ। ফলে খুব দ্রুত খাবার গরম হয় এবং বিদ্যুৎও তুলনামূলক কম খরচ হয়।
সুবিধা:
ইন্ডাকশন চুলায় রান্না খুব দ্রুত হয়। পানি ফুটানো বা তরকারি রান্না করতে কম সময় লাগে। যেহেতু তাপ সরাসরি পাত্রে তৈরি হয়, তাই শক্তি অপচয় কম হয়। চুলার উপরের কাচ খুব গরম হয় না, ফলে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কম।
অসুবিধা:
সব ধরনের হাঁড়ি পাতিল এতে কাজ করে না। লোহার বা ম্যাগনেটযুক্ত পাত্র লাগবে। অ্যালুমিনিয়াম বা কাচের বাসন ব্যবহার করা যায় না, যদি না তলায় বিশেষ স্তর থাকে। এছাড়া বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্না বন্ধ হয়ে যায়।
ইনফ্রারেড চুলা কীভাবে কাজ করে
ইনফ্রারেড চুলা তাপ রশ্মির মাধ্যমে কাজ করে। চুলার ভেতরে থাকা হিটিং এলিমেন্ট লাল হয়ে জ্বলে ওঠে এবং সেই তাপ সরাসরি পাত্রের নিচে লাগে। গ্যাসের চুলার মতোই এটি তাপ ছড়িয়ে রান্না করে, তবে আগুন ছাড়া।
সুবিধা:
এই চুলায় যে কোনো ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম, কাচ, স্টিল, মাটির পাত্র-যে কোনোটাই ব্যবহার করতে পারবেন। এই চুলার জন্য আলাদা করে হাড়ি-পাতিল কিনতে হয় না। বিদ্যুৎ ওঠানামা হলেও এটি তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে কাজ করে।
অসুবিধা:
ইন্ডাকশনের তুলনায় এটি বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। তাপ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে রান্নাঘর গরম হয়। চুলার কাচ অনেক বেশি গরম হয়ে যায়, তাই সাবধান না হলে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিদ্যুৎ খরচ ও দক্ষতা
ইন্ডাকশন চুলা প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ শক্তিকে সরাসরি রান্নায় ব্যবহার করে, তাই বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলা প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ দক্ষতায় কাজ করে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে ইন্ডাকশন বেশি সাশ্রয়ী। এতে মাসে বিদ্যুৎ খরচ কম হয় ইনফ্রারেড চুলার চেয়ে।
রান্নার গতি ও নিয়ন্ত্রণ
ইন্ডাকশন চুলায় তাপ নিয়ন্ত্রণ খুব নিখুঁত। দ্রুত গরম হয় এবং চুলা বন্ধ করলেই তাপ বন্ধ হয়ে যায়। ইনফ্রারেডে তাপ ওঠানামা তুলনামূলক ধীর, তাই হালকা আঁচে রান্না করতে একটু সময় লাগে।
নিরাপত্তা দিক
নিরাপত্তা দিক বিবেচনা করলে ইন্ডাকশন চুলা তুলনামূলক বেশি নিরাপদ, কারণ পাত্র না রাখলে এটি গরমই হয় না। ঘরে শিশুরা থাকলে এটি বেশি ভালো। ইনফ্রারেডে চুলার পৃষ্ঠ অনেক গরম হয়, তাই অসাবধানতায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
কোনটি আপনার জন্য ভালো?
ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড দুটোরই নিজস্ব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আপনার রান্নার অভ্যাস, বিদ্যুৎ খরচ, বাসনের ধরন ও পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিকটি বেছে নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। যদি আপনি দ্রুত রান্না, কম বিদ্যুৎ খরচ এবং বেশি নিরাপত্তা চান, তাহলে ইন্ডাকশন চুলা ভালো পছন্দ। তবে যদি আপনি পুরোনো সব বাসন ব্যবহার করতে চান এবং রান্নার ধরন গ্যাসের মতো রাখতে চান, তাহলে ইনফ্রারেড চুলা সুবিধাজনক।
*দ্রুত রান্না, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং নিরাপত্তার দিক থেকে ইন্ডাকশন চুলা ভালো।
*তবে বিভিন্ন ধরনের পাত্র ব্যবহারের সুবিধা চাইলে ইনফ্রারেড চুলা বেশি সুবিধাজনক।
*যে ধরনের চুলাই ব্যবহার করেন না কেন, সঠিক নিয়ম মেনে চললে চুলা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং রান্না হয় নিরাপদ।
মন্তব্য করুন