
আল্লাহ তাআলার কাছে ছোট বড় কোনো প্রয়োজন প্রার্থনা করা, বিশেষ কোনো কিছু চাওয়া কিংবা বিপদ মসিবত ও দুঃখ পেরেশানী থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে দু রাকাত নামায পড়ে দুআ করা―একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। এ আমলের ব্যাপারে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াত থেকে যেমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তেমনি হাদীস শরীফেও পাওয়া যায় বেশ কিছু বর্ণনা। ফিকহের পরিভাষায় এই নামাযকে বলে ‘সালাতুল হাজত’।
বিখ্যাত সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. বলেন―
كَانَ النَّبيّ صَلّى الله عَلَيهِ وسَلَّم إِذَا حَزَبَه أَمْرٌ صَلَّى.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো সমস্যা বা পেরেশানীর সম্মুখীন হতেন, নামাযে মগ্ন হতেন। ―সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩১৯
হাদীসটির সনদ হাসান। [দ্রষ্টব্য : ফাতহুল বারী ৩/১৭২ (১৩০২ নং হাদীসের অধীনে।)]
হযরত আলী রা. বলেন―
لَقَدْ رَأَيْتُنَا لَيْلَةَ بَدْرٍ، وَمَا مِنَّا إِنْسَانٌ إِلا نَائِمٌ، إِلا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم، فَإِنَّه كَانَ يُصَلِّي إِلَى شَجَرَةٍ، وَيَدْعُو حَتَّى أَصْبَحَ.
আমি বদরযুদ্ধের রাতে দেখেছি, আমরা সকলে ঘুমিয়ে আছি কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত। তিনি একটি গাছের কাছে দাঁড়িয়ে ভোর হওয়া পর্যন্ত নামায পড়ছিলেন এবং দুআ করছিলেন। ―মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১১৬১; মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী, হাদীস ১১৮; সুনানে কুবরা, নাসায়ী, হাদীস ৮২৫ (হাদীসটির সনদ সহীহ)
কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আ. ও ঈসা আ.-কে বিপদ ও মসিবতের কঠিন পরিস্থিতিতে নামাযের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন―
وَ اَوْحَيْنَاۤ اِلٰي مُوْسٰي وَ اَخِيْهِ اَنْ تَبَوَّاٰ لِقَوْمِكُمَا بِمِصْرَ بُيُوْتًا وَّ اجْعَلُوْا بُيُوْتَكُمْ قِبْلَةً وَّ اَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَ بَشِّرِ الْمُؤْمِنِيْنَ.
আমি মূসা ও তার ভাইয়ের প্রতি আদেশ পাঠালাম যে, তোমরা তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য মিশরে ঘর-বাড়ি স্থাপন কর এবং তোমাদের ঘরগুলোকে নামাযের স্থান বানাও এবং যথাযথভাবে নামায আদায় কর। আর ঈমান আনয়নকারীদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর। ―সূরা ইউনুস (১০) : ৮৭
এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, যখন মূসা আ. ও তাঁর সম্প্রদায়ের ওপর ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কঠিন জুলুম-নির্যাতন শুরু হল এবং তারা তাঁদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করল, তাঁদের জন্য চারপাশ সংকীর্ণ করে দিল, তখন আল্লাহ তাআলা অধিক পরিমাণে নামায আদায়ের নির্দেশ দিলেন। যেমন নির্দেশ দিয়েছেন একথা বলে যে, (তরজমা) ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাও’। [―সূরা বাকারা (২) ১৫৬] আর আয়াতের শেষে বলেছেন―‘ঈমান আনয়নকারীদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর।’ অর্থাৎ তাদেরকে সওয়াব ও প্রতিদান এবং সাহায্য ও বিজয়ের সুসংবাদ দাও। ―তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/২৮৯
মুমিন তার যাবতীয় প্রয়োজনের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চাইবে―সে বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি প্রসঙ্গ এসেছে নিম্নোক্ত আয়াতে। আল্লাহ তাআলা বলেন―
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَّبْرِ وَ الصَّلٰوةِ اِنَّ اللهَ مَعَ الصّٰبِرِيْنَ .
হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। ―সূরা বাকারা (২) : ১৫৩
এখানে মুমিনদেরকে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্বীনী ও দুনিয়াবী এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়―যে কোনো ধরনের, যেকোনো প্রয়োজনে মুমিন ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাইবে। এই ব্যাপকতা আয়াতটির মর্মে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। (দ্রষ্টব্য : তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/২৫১; তাফসীরে মাযহারী ১/১৫১; তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ১/৩৯৪)
এখানে সাহায্য চাওয়ার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুটি বিষয়। সবর ও সালাত।
সবরের শাব্দিক অর্থ, ধৈর্য। দ্বীন ও শরীয়তে সবরের তিনটি ক্ষেত্রকে মৌলিকভাবে উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে।
এক. যাবতীয় গোনাহ ও পাপাচার থেকে ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেকে বিরত রাখা।
দুই. আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেকে অবিচল রাখা।
তিন. বিপদাপদ ও বালা-মসিবতের ক্ষেত্রে সংযম অবলম্বন করা। অর্থাৎ যাবতীয় বিপদ ও মসিবত আল্লাহ তাআলার হুকুমেই এসে থাকে―এই বিশ্বাস জাগ্রত রাখা এবং এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ, ক্ষমা ও প্রতিদান আশা করা। ―আররিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৮৩; তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/২৫১-৫২
সালাতুল হাজতের নিয়ম
সালাতুল হাজতের নামায কমপক্ষে দুই রাকাত। তবে একই প্রয়োজনে বারবার দুই রাকাত করে অনেক রাকাত পড়তেও সমস্যা নেই।
এই নামায যেকোনো সাধারণ নফল নামাযের মতোই। সূরা কেরাত ও বিভিন্ন তাসবীহ একই। নিয়তের সময় শুধু খেয়াল থাকবে যে, আমি আমার নির্দিষ্ট প্রয়োজন/সকল প্রয়োজন/উম্মতের সকল প্রয়োজন পুরা হওয়ার জন্য দুই রাকাত নামায আদায় করছি।
নামাযের আগে অন্য নামাযের মতোই প্রথমে উত্তমভাবে ওযু করে নেবে। আগে থেকে ওযু অবস্থায় থাকলে তো ঠিক আছে। তার পরও নতুন ওযু করে নিলে ভালো।
উত্তমভাবে ওযু করার অর্থ হল, সুন্দরভাবে, ওযুর সব ফরয সুন্নত ও মুস্তাহাবের প্রতি পূর্ণ যত্নবান হয়ে, গুরুত্বের সাথে ওযু করা। দায়সারাভাবে কিংবা কোনো রকম শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধোওয়া নয়।
সুযোগ থাকলে একথাও স্মরণ করা যে, ওযু হল পবিত্রতা অর্জনের একটি শরয়ী মাধ্যম। এটি মহিমান্বিত অনেক ইবাদতের পূর্ব প্রস্তুতি এবং এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। ওযুর মাধ্যমে পবিত্রতা হাসিল হয় এবং বান্দার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা কৃত বিভিন্ন গোনাহ ধুয়ে যায়।
ওযুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে হয়। শেষে পড়তে হয়―
أَشْهَدُ أَنْ لا إِلهَ إِلّا اللهُ وَحْدَه لَا شَرِيكَ لَهٗ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُولُه، اَللّٰهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ.
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক। তাঁর কোনো শরীক বা অংশীদার নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ―জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৫
এভাবে যত্নের সাথে ওযু করার পর পূর্ণ ধ্যান ও মনোযোগ এবং পূর্ণ খুশু ও খুযূর সাথে দুই রাকাত নামায পড়বে।
নামাযের পর আল্লাহ তাআলার হামদ ও প্রশংসা করবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করবে। এটা সকল দুআর ক্ষেত্রেই কাম্য।
আল্লাহ তাআলার হামদ ও প্রশংসার মাধ্যমে মূলত তাঁর শোকর আদায় করা হয়। বান্দার প্রতি তাঁর সার্বক্ষণিক ও সীমাহীন নিআমতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। যা আল্লাহ তাআলার খুব পছন্দ।
দরূদ ও সালামের মাধ্যমে নবীজীর প্রতি যেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়, তেমনি প্রভূত কল্যাণ ও রহমত লাভ করা যায়। এছাড়াও দরূদ-সালামের অনেক ফায়েদা ও ফযীলত রয়েছে।
হামদ ও ছানা এবং দরূদ ও সালাম পেশ করার পর হাজত ও প্রয়োজন পূরণের প্রেক্ষিতে বর্ণিত হাদীসে শেখানো যে কোনো দুআ পড়বে। কিংবা নিজের মতো করে নিজের সব প্রয়োজন আল্লাহ তাআলার কাছে তুলে ধরবে। কাকুতি মিনতি করে আল্লাহ তাআলার কাছে নির্দিষ্ট বিষয়ে এবং জীবনের সকল প্রয়োজনের ক্ষেত্রে খায়ের ও কল্যাণ প্রার্থনা করবে।
হাজত পূরণের দুআ
হাদীস ভাণ্ডারে বান্দার হাজত ও প্রয়োজন পূরণের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দুআ বর্ণিত হয়েছে। জামে তিরমিযী ও ইবনে মাজাহসহ হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে একটি দুআর কথা এসেছে, সেটি খুব প্রসিদ্ধ। অত্যন্ত মর্মসমৃদ্ধ সেই দুআটি এখানে তুলে দিচ্ছি―
لَا إِلهَ إِلّا اللهُ الحَلِيمُ الكَرِيمُ، سُبْحَانَ اللهِ رَبِّ العَرْشِ العَظِيمِ، الحَمْدُ لِلهِ رَبِّ العَالَمِينَ، أَسْأَلُكَ مُوجِبَاتِ رَحْمَتِكَ، وَعَزَائِمَ مَغْفِرَتِكَ، وَالغَنِيمَةَ مِنْ كُلِّ بِرٍّ، وَالسَّلَامَةَ مِنْ كُلِّ إِثْمٍ، لَا تَدَعْ لِي ذَنْبًا إِلّا غَفَرْتَهٗ، وَلَا هَمًّا إِلّا فَرَّجْتَهٗ، وَلَا حَاجَةً هِيَ لَكَ رِضًا إِلّا قَضَيْتَهَا يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ
দুআটির অর্থ :
আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। যিনি অত্যন্ত সহনশীল ও পরম মমতাময়। আল্লাহ পবিত্র, যিনি আরশে আযীমের মালিক। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগতসমূহের রব।
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ঐসব জিনিস প্রার্থনা করি, যেগুলো আপনার রহমতকে অবধারিত করে এবং ঐসব জিনিস প্রার্থনা করি, যেগুলো আপনার ক্ষমাকে অনিবার্য করে। (প্রার্থনা করি) সকল নেককাজের তাওফীক এবং সকল গোনাহ থেকে নিরাপত্তা। আপনি আমার কোনো গোনাহ ক্ষমা না করে ছাড়বেন না এবং কোনো পেরেশানী দূর করা থেকে বাদ রাখবেন না। আর আমার কোনো প্রয়োজন―যাতে আপনার সন্তুষ্টি রয়েছে- তা অপূরণ অবস্থায় রেখে দিবেন না; হে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দয়ালু! ―জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৭৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৮৪
মাওলানা মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব
সুত্র মাসিক আল কাউসার
মন্তব্য করুন