
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকির জবাবে একসঙ্গে সাতটি ইউরোপীয় দেশ সেখানে সেনা মোতায়েন শুরু করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর এই পদক্ষেপকে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় শক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের নতুন মন্তব্য ইউরোপে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন জানাতে বৃহস্পতিবার গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনারা পৌঁছাতে শুরু করেছে। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন এক অপ্রত্যাশিত অবস্থান ইউরোপীয় নেতাদের আরও চাপে ফেলেছে। ওয়াশিংটনে বুধবার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর ডেনমার্কের শীর্ষ কূটনীতিক জানান, ট্রাম্প ইউরোপের ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড ‘দখলের’ লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।
এরপরই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থান বদলে ট্রাম্প বলেন, শান্তির পথে প্রধান বাধা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নন, বরং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এই মন্তব্য ইউরোপজুড়ে নতুন করে প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, কারণ এত দিন ইউরোপের উদ্বেগ মূলত গ্রিনল্যান্ড ঘিরেই কেন্দ্রীভূত ছিল।

এসবিসি নিউজ বলছে, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেনের সীমিতসংখ্যক সামরিক সদস্য গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছাতে শুরু করেন। এর আগে এক ভাষণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, আগামী দিনগুলোতে তার দেশ গ্রিনল্যান্ডে আরও স্থল, আকাশ ও নৌ সামরিক সরঞ্জাম পাঠাবে।
জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে একটি এয়ারবাসে করে ১৩ সদস্যের একটি নজরদারি দল গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকে পৌঁছেছে।
এর আগে বুধবার রাতে ডেনিশ বিমান বাহিনীর একটি বিমান নুক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে সামরিক পোশাক পরা সদস্যদের নামতে দেখা যায়।
সেনা মোতায়েনে যুক্ত রয়েছে ফ্রান্সও। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘ফ্রান্সের প্রথম সামরিক দল ইতোমধ্যে রওনা হয়েছে, আরও যাবে।’
পোল্যান্ডে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত অলিভিয়ে পোয়াভো দাভো বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন করা ফরাসি দলে প্রায় ১৫ জন পর্বত বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে চাই—ন্যাটো এখানে আছে। গ্রিনল্যান্ডে নজরদারি সক্ষমতা বাড়িয়েছে ডেনমার্ক এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।’
জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে জানায়, ডেনমার্কের অনুরোধে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে একজন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রিনল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নরওয়ে দুজন ও সুইডেন বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা পাঠাবে।
গ্রিনল্যান্ডসহ আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ সামরিক মহড়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করতেই এই সেনা মোতায়েন করছে ডেনমার্ক ও তার মিত্ররা।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পুলসেন জানান, লক্ষ্য হলো গ্রিনল্যান্ডে আরও স্থায়ী ও শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা। ডেনিশ গণমাধ্যম ডিআর জানায়, একাধিক ন্যাটো দেশের সেনারা পর্যায়ক্রমে সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের লক্ষ্যকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করবে না। তিনি জানান, ডেনমার্কের সঙ্গে ‘কৌশলগত আলোচনা’ চলবে।
এর আগে বুধবার গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের শীর্ষ কূটনীতিকরা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের পর স্বীকার করেন, আধা-স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ‘মৌলিক মতবিরোধ’ রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখল করা উচিত। তার দাবি, চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি এই পদক্ষেপকে জরুরি করে তুলেছে।
এর জবাবে ডেনমার্ক জানায়, ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় গ্রিনল্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় তারা সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলো এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চায়— আর্কটিক সুরক্ষায় আমেরিকার দখল নেয়ার প্রয়োজন নেই।
এদিকে বেলজিয়ামে অবস্থিত রুশ দূতাবাস অভিযোগ করেছে, মস্কো ও বেইজিংয়ের হুমকির অজুহাতে ন্যাটো সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এছাড়া রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা সতর্ক করে বলেন, এই অঞ্চলে রাশিয়ার স্বার্থ উপেক্ষা করলে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী।
মন্তব্য করুন