সেই সাথে বেড়েছে যানজট

রাজধানী ঢাকায় তীব্র যানজটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট । জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে দেশের বিভিন্ন এলাকার পেট্রল পাম্পগুলোতে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা-সংঘাতের প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়।
জ্বালানি তেল সংকটে দেশের অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ। যেগুলো খোলা আছে, সেখানে লম্বা লাইন দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন যানবাহন চালকরা।
তেলের সঙ্কট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এর জেরে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে হাতেগোনা কয়েকটি পাম্পে থেকে পাওয়া যাচ্ছে সামান্য তেল। বাকি পাম্পগুলো বেশির ভাগ সময় থাকছে বন্ধ।
জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা। গরমে চরম ভোগান্তি হলেও উপায় নেই। দিনের পর দিন এভাবেই চলছে তেল সংগ্রহ। পাম্পলোতে অপেক্ষা করতে করতে গ্রাহকরা এতটাই রুক্ষ হয়ে উঠছেন যে অল্পতেই একে অপরের ওপর চড়াও হচ্ছেন। এমনকি জরুরি সেবার গাড়িগুলোকে বিশেষ সুবিধায় তেল নিতেও বাধা দিচ্ছেন তারা।
দেশের জ্বালানি সংকটের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি, নগরজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দীর্ঘ সারি এখন সড়কের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে, ফলে স্বাভাবিক যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকার সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে দাবি করলেও বাস্তবে তেল সংগ্রহে ভোগান্তি বাড়ছে, আর সেই চাপ সরাসরি পড়ছে ট্রাফিক ব্যবস্থায়।
ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলার ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। নির্দিষ্ট লেন বা আলাদা সারি ব্যবস্থাপনা না থাকায় জ্বালানির জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহন সরাসরি মূল সড়কে প্রভাব ফেলছে।
একই সময়ে গণপরিবহনের শৃঙ্খলাহীনতা, লেন না মানা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং দুর্বল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডেমরা থেকে উত্তরা, মহাখালী থেকে গুলিস্তান প্রায় সর্বত্র ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক যানবাহনের দীর্ঘ লাইন নতুন করে জট সৃষ্টি করছে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের সড়কে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে জরুরি সেবাগ্রহীতারা সবাই পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ভোর, কোনো কোনো সময় রাত থেকে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে সংখ্যায় অল্প হলেও আছে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। অনেক ক্ষেত্রে এই সারি মূল সড়ক ছাড়িয়ে পাশের লেন দখল করে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও লাইনের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি যান চলাচলের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
খিলক্ষেতের ফিলিং স্টেশনের লাইন ঠেকে যাচ্ছে জিয়া কলোনি পর্যন্ত। আবার তেজগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইন প্রধানমন্ত্রীর অফিস ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত। ফলে বিমানবন্দর হয়ে উত্তরার দিকে যেতে সময় লাগছে বেশি। অন্যদিকে মহাখালী থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতেও পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার কারণে বাসের দৈনিক ট্রিপ কমে যাচ্ছে। এতে সড়কে চলাচলরত বাসের সংখ্যা সাময়িকভাবে কমে গেলেও যেসব বাস লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলোই উল্টো সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট কমার পরিবর্তে আরও দীর্ঘ হচ্ছে। যাত্রীরাও পড়ছেন দ্বিমুখী ভোগান্তিতে। একদিকে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না পেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যে বাসগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও যানজটে আটকে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগছে কয়েকগুণ বেশি সময়। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও পড়ছেন একই পরিস্থিতিতে।
একই চিত্র গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকার মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও দেখা গেছে। অফিস সময়কে কেন্দ্র করে যখন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে, তখন ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে করে কয়েকশ মিটার এলাকার যানজট দ্রুত কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
পরিবাগে একটি ফিলিং স্টেশনে গতকাল মোটরসাইকেলের জন্য অকটেন নিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন চাকুরিজীবী জানান, ভোর সাড়ে ৬টায় তিনি লাইনে দাঁড়াতে এসে দেখেন সামনে আরো আড়াইশ মানুষ। তিনি বলেন, সরকার অকটেন-পেট্রোলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে জানাচ্ছে। কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে বলা হচ্ছে মজুদ নেই। এভাবে তো হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ২০০-৫০০ টাকার তেল পাচ্ছি। এতে একদিন পরপরই তেলের প্রয়োজন হচ্ছে। রাজধানীতেই যদি এমন সংকট হয়, তাহলে তো প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। একটা সিস্টেম দাঁড় করানো দরকার। তেল নিতে গিয়ে দিন পার হয়ে যাচ্ছে। কাজ করব কখন।

নিজস্ব প্রতিবেদক


