দেশে প্রতিনিয়তই বাড়ছে ধর্ষণ , নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান, বাড়ছে না নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার

দেশে প্রতিনিয়তই বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের লোমহর্ষক পরিসংখ্যান, কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা আইনি ন্যায়বিচার। চলতি ২০২৬ সালে একের পর এক শিশু ধর্ষণ, নৃশংসভাবে হত্যা ও পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ছে কোনো না কোনো অবুঝ শিশুর ক্ষতবিক্ষত লাশ কিংবা কোনো মায়ের আর্তনাদ। এই লাগামহীন অপরাধ প্রবণতা দেশকে এক চরম মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং নৃশংসতার ঘটনাগুলো দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে । পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ধর্ষণের ঘটনা ২৭ থেকে ৫২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে । বিবিএস ও ইউএনএফপিএ-এর জরিপে বরিশাল বিভাগকে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ৮২ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন ।
শিশু ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ভয়াবহ চিত্র
চলতি বছরের বিগত ৯ মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাগুলো নৃশংসতার চরম সীমা স্পর্শ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে চার শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক শিশুকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু নৃশংসতার লোমহর্ষক খণ্ডচিত্র
১. জামালপুরে সহপাঠীর ঘরে শিশু হত্যা (সেপ্টেম্বর ২০২৬): মাদারগঞ্জে প্রথম শ্রেণির এক সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মাটির নিচে পুঁতে রাখার ঘটনা ঘটে । এই ঘটনায় অভিযুক্ত জামিনুর ইসলামকে আটকের মাধ্যমে চেনা প্রতিবেশীর ঘরেও শিশুদের চরম নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ পায় ।
২. চন্দনাইশে গৃহবধূ হত্যা: পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় হাত-পা ও গলা রশি দিয়ে বেঁধে মিনহাজ খাতুন নামের এক গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে ।
৩. পল্লবীতে শিশু রামিসা এবং অন্যান্য মর্মান্তিক ঘটনা: পল্লবীতে স্কুল থেকে ফেরার পথে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয় ।
এছাড়া সীতাকুণ্ডে শিশু ইরা, সিলেটে শিশু ফাহিমা , পাবনায় দাদি-নাতনি এবং নরসিংদীতে কিশোরী অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনাগুলো সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে ।বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অবক্ষয়ের নেপথ্যেঅপরাধের নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক অসচেতনতা, মাদক ও পর্নোগ্রাফির পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রাখছে ।
সুপ্রিম ও ব্র্যাকের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা আদালতে ঝুলে আছে, যেখানে ১৮০ দিনের বদলে মামলা নিষ্পত্তিতে প্রায় ১,৩৭০ দিন সময় লাগছে । এছাড়া দৈনিক প্রথম আলোর তথ্যমতে, এসব মামলায় মাত্র ৩ শতাংশ আসামির সাজা হয় ।
রাষ্ট্র ও সমাজের জরুরি করণীয়দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ: বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান [০.১.১]।প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা: রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত থেকে সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা ।সচেতনতা ও দমন: পারিবারিক নজরদারি বৃদ্ধি এবং মাদক ও পর্নোগ্রাফি কঠোর হস্তে দমন
বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতে, শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার কঠোর প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ৯০ দিনের মধ্যে বিচার কার্য সম্পন্ন করে অপরাধীদের প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে, পুলিশি টহল জোরদার করা, দ্রুত আইনি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই অন্ধকার থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি। ধর্ষণের শিকারদের বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোরী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউএনএফপিএ’র যৌথ জরিপ আরও ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এনেছে। দেশের আট বিভাগের মধ্যে নারী নির্যাতনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ।
জরিপ অনুযায়ী—
বরিশালে জীবনে অন্তত একবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮২ শতাংশ নারী
গত এক বছরে নতুন করে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৭ শতাংশ নারী
যৌন নির্যাতনের হার ৩৫.৭ শতাংশ
স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনাও সবচেয়ে বেশি এই বিভাগে
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন নারীর কান্না, একটি শিশুর আতঙ্ক, একটি পরিবারের ভাঙনের গল্প।
পরিসংখ্যান বাড়লেও কেন কমছে না অপরাধ? সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা।
১. **ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া:** নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার পাহাড় জমলেও নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত নিরাশাজনক। একটি মামলার রায় হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে।
২. **দুর্বল তদন্ত ও সাক্ষীর অভাব:** অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামিদের চাপে বা ত্রুটিপূর্ণ পুলিশি তদন্তের কারণে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে উল্টো হুমকি দিচ্ছে।
৩. **সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতা:** অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার এই দৃষ্টান্ত সমাজকে আরও বেশি অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
আইন-শৃঙ্খলার এই চরম অবনতিতে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে কিংবা বাইরে খেলতে দিয়ে অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত উৎকণ্ঠায় থাকছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে নাগরিক সমাজ, ছাত্র সমাজ ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিনিয়ত মানববন্ধ ও বিক্ষোভ করছেন। তাদের একটাই দাবি—ফাঁকা আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
দেশবাসী আজ এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। সরকার ও প্রশাসন যদি এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই সহিংসতা সমাজকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে দাঁড় করাবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক


